আজকের কুমিল্লা মিডিয়া ২৪ সংবাদ
Cumilla Media 24
প্রকাশ : মে ১৮, ২০২৬ইং অনলাইন সংস্করণ

মাদকের কব্জায় দেশ

মোঃ শাহজাহন বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার 

দেশজুড়ে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি ধীরে ধীরে ভয়াবহ সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই মাদকের ভয়াল থাবা ও রাজত্ব ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের ওপর। বাড়ছে পারিবারিক কলহ, ভাঙছে সংসার, প্রিয়জনের হাতে প্রিয়জন খুনসহ ঘটছে নানা অপরাধ। মাদকের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে পুরো দেশ। সরকারের জিরো টলারেন্স ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় মাদক এখন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, আইস ও ফেনসিডিলের মতো মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। উদ্বেগজনকভাবে তরুণদের একটি বড় অংশ দ্রুত মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অলিগলি, এমনকি কিছু অভিজাত এলাকাতেও মাদক ব্যবসার গোপন নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদকের ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে পারিবারিক জীবনে। একজন ব্যক্তি মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে প্রথমেই তার আচরণে পরিবর্তন আসে। পরিবারে অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক নির্যাতন ও সহিংসতা বাড়তে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে, সন্তানরা অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হচ্ছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে পারিবারিক কলহ থেকে ভয়াবহ বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বেড়েছে। বিশেষ করে মাদকের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে বা নেশায় বাধা পেয়ে এ ধরনের সহিংসতার ঘটনাগুলো ক্রমাগত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় মাদকাসক্ত ফোরকান মোল্লা (৪০) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তার স্ত্রী, তিন মেয়ে এবং শ্যালককে জবাই করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে, পরে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে ধারণা করা হয়। কুমিল্লার দেবিদ্বারে মাদকাসক্ত ছেলের বেধড়ক মারধরে মারা গেছেন বাবা। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে বাবা নিহতের ঘটনা ঘটেছে। ফেনীর দাগনভূঞায় মাদকের টাকা না পেয়ে মাকে খুন এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। চট্টগ্রামের বন্দর থানা এলাকায় জুয়া ও মাদকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। টাঙ্গাইলে মাদকের টাকা না পেয়ে গৃহবধূকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ, কুষ্টিয়ায় স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ এবং বগুড়ায় মা-বাবার ওপর নির্যাতনের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

বিশিষ্ট অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, মাদক এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। এটি মাইনর ক্রাইম থেকে শুরু করে সিভিয়ার ক্রাইম পর্যন্ত ভয়াবহ সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে মাদককে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছে এবং আনুমানিক ৭০ থেকে ৭৫ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। এই বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের কারণে দেশজুড়ে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। মাদকাসক্তরা প্রথমেই তাদের পরিবারকে টার্গেট করে অর্থ সংগ্রহ করে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় পারিবারিক কলহ, সহিংসতা এবং হত্যাকাণ্ড।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি থাকলেও ভৌগোলিক বাস্তবতা, দুর্গম এলাকা এবং সীমিত জনবলের কারণে মাদক প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম এলাকা, চরাঞ্চল ও নদীপথ ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা মাদক দেশে প্রবেশ করাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করা এবং মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্বতন্ত্র মাদক আদালত গঠন সময়ের দাবি।

ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার বলেন, শুধু খুচরা বিক্রেতা ও সেবনকারীদের ধরলেই মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর পেছনের গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও মানি লন্ডারিং আইনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। র‍্যাবের মিডিয়া ডিরেক্টর এমজেডএম ইন্তেখাব জানান, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং ভবিষ্যতেও তা আরও কঠোরভাবে অব্যাহত থাকবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক নজরদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কার্যক্রম, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা, গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা এবং অবৈধ সম্পদ জব্দ—এসব পদক্ষেপ ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাদক এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি জাতীয় অস্তিত্বের জন্য হুমকি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এখন সময়ের দাবি—এটি কোনো বিকল্প নয়।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হোমনায় পুত্রবধূর আঘাতে গুরুতর আহত বৃদ্ধা, হাসপাতালে মৃত্যুর

1

রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যায় জিএম কাদেরের শোক ও নিন্

2

দাউদকান্দিতে ৩০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ১, ডাকাতির প্রস্তুতিকা

3

সংবাদ শুধু প্রকাশ নয়, সত্য উদ্ঘাটন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার

4

বুড়িচং মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবনিযুক্ত ১২ শিক্ষক ও হিসাব

5

দাউদকান্দিতে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, নিহতের পরিবারের দাবি হ

6

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে দাউদকান্দিতে নিসচার নতুন কমিটি ঘোষণা

7

আন্তর্জাতিক পলিসি ডিসকাশন কনফারেন্সে UCLA-তে বক্তব্য রাখলেন

8

দাউদকান্দিতে নিসচার উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ

9

এআইইউবিতে চাকরি মেলা অনুষ্ঠিত

10

জামায়াতের মিথ্যাচার জনগণ ক্ষমা করবে না: মির্জা ফখরুল

11

প্রবীর মিত্রের শেষ দিনগুলো যেমন ছিল

12

দাউদকান্দিতে ইউনিক বাসে অভিযান, ১৮ কেজি গাঁজাসহ আটক ২

13

মুক্তমত প্রকাশ–সংক্রান্ত ও গায়েবি মামলা ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্

14

বিদেশি অস্ত্রসহ মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মাওরা সোহেল’

15

মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশের প্রতিবাদে বুড়িচং উ

16

দাউদকান্দিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের প্রতি

17

রিকশাচালককে গুলি করে হত্যা মামলায় কারাগারে চিকিৎসকসহ পাঁচজন

18

ব্রাহ্মণপাড়ায় ‘মদিনার কাফেলা বাংলাদেশ’-এর উপজেলা কাউন্সিল অধ

19

সরকার গ্রুপের টেবিল টেনিস টুর্নামেন্ট সম্পন্ন, নতুন পরিকল্পন

20