আজকের কুমিল্লা মিডিয়া ২৪ সংবাদ
Cumilla Media 24
প্রকাশ : Jul ১৯, ২০২৬ইং অনলাইন সংস্করণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ভবিষ্যতের সহযাত্রী

মোঃ শাহজাহান বাশার

প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার রয়েছে, যা মানবসভ্যতার গতিপথই বদলে দিয়েছে। চাকা, ছাপাখানা, বিদ্যুৎ, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের মতোই একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তিগত বিপ্লবের নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI)। একসময় যা ছিল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয়, আজ তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা। মোবাইল ফোনের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে শুরু করে হাসপাতালের রোগ নির্ণয়, কৃষিতে ফলনের পূর্বাভাস, ব্যাংকিং সেবা, শিল্প উৎপাদন, শিক্ষা, গণমাধ্যম—সবখানেই দ্রুত বিস্তার ঘটছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার।

তবে এই প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা যত দ্রুত হচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রশ্নও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি? নাকি এটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে? মানুষ কি যন্ত্রের কাছে হার মানবে, নাকি মানুষ ও যন্ত্রের সহযোগিতায় গড়ে উঠবে আরও দক্ষ ও সমৃদ্ধ সমাজ?

ইতিহাস বলে, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবের শুরুতে ভয় ছিল। শিল্পবিপ্লবের সময়ও অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, যন্ত্র মানুষের কাজ কেড়ে নেবে। বাস্তবে কিছু কাজ হারিয়ে গেলেও সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য নতুন পেশা ও শিল্পখাত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। কিছু একঘেয়ে ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন দক্ষতার চাহিদা, নতুন কর্মক্ষেত্র এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।

আজকের বিশ্বে চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে AI-এর সহায়তা নিচ্ছেন, কৃষক আবহাওয়া ও মাটির তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, শিক্ষক শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নে প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, আবার সাংবাদিকও তথ্য বিশ্লেষণ ও গবেষণার কাজে AI-কে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ AI মানুষের বিকল্প নয়; বরং দক্ষতার পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। যে মানুষ প্রযুক্তিকে বুঝে ব্যবহার করতে পারবে, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে তারাই এগিয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের জন্যও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ—এই তিনটি বিষয় আমাদের সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। সরকারি সেবা ডিজিটাল করা, কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়নে AI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলা ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন হলে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কাজ আরও সহজ ও কার্যকর হবে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনশক্তির অভাব। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার জানলেই হবে না; ডেটা বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং, নৈতিকতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতাও প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর শিক্ষা নয়, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার শিখতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের সত্যতা ও নৈতিকতা। বর্তমানে AI এমন লেখা, ছবি, ভিডিও এবং কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পারে, যা অনেক সময় বাস্তব থেকে আলাদা করা কঠিন। এর ফলে ভুয়া খবর, পরিচয় জালিয়াতি, প্রতারণা এবং জনমত প্রভাবিত করার ঝুঁকি বেড়েছে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যেমন বাড়বে, তেমনি তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতিও শক্তিশালী করতে হবে। প্রযুক্তির পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ও ডিজিটাল সচেতনতা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগও অমূলক নয়। কিছু পেশায় স্বয়ংক্রিয়তা বাড়ার ফলে কাজের ধরন বদলাবে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, পরিবর্তনের সঙ্গে যারা নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়েছেন, তারাই নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে শুধু সনদ নয়, শেখার ক্ষমতা, অভিযোজন, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতাই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ।

গণমাধ্যমেও AI নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ, বড় ডেটা থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করা, অনুবাদ, ভাষা সম্পাদনা কিংবা গবেষণায় এটি সহায়ক হতে পারে। তবে সাংবাদিকতার মূল শক্তি—সত্য অনুসন্ধান, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, মানবিক অনুভূতি এবং নৈতিক বিচার—এসব এখনো মানুষের হাতেই নিরাপদ। AI একজন সহকারী হতে পারে, কিন্তু একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিকল্প হতে পারে না।

নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও এখন সময়োপযোগী পদক্ষেপ প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যেন স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং মানবাধিকারসম্মত হয়, সে জন্য উপযুক্ত নীতি, আইনি কাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিদেশি প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলাও ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।

সবচেয়ে বড় কথা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভয়ের চোখে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে বুঝতে হবে, শিখতে হবে এবং মানবকল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। প্রযুক্তি কখনোই নিজে সিদ্ধান্ত নেয় না; সিদ্ধান্ত নেয় মানুষ। তাই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমাদের মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং দূরদর্শিতার ওপর।

বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে AI হবে উন্নয়নের গতি বাড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার। শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রশাসন এবং উদ্যোক্তা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, সেবার মান উন্নত করতে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে।

অতএব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের সহযাত্রী হিসেবে দেখাই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। যে সমাজ প্রযুক্তিকে গ্রহণ করবে কিন্তু মানবিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দেবে না, যে রাষ্ট্র উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে কিন্তু জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, এবং যে মানুষ সারাজীবন শেখার মানসিকতা ধরে রাখবে—ভবিষ্যৎ হবে তাদেরই।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ শুরু হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন প্রযুক্তি আসবে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা এই পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত। প্রস্তুত হতে পারলে AI হবে উন্নয়নের সোপান, আর প্রস্তুতি না থাকলে সেটিই হয়ে উঠবে নতুন বৈষম্যের কারণ। তাই সময়ের দাবি—প্রযুক্তিকে গ্রহণ, দক্ষতাকে উন্নত এবং মানবিকতাকে অটুট রাখা।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বেজরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগ

1

জব্বারের বলিতে ইতিহাস, টানা তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ

2

ডিবি (উত্তর)-এর বিশেষ অভিযানে ৯ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার, উদ্ধ

3

‘বিটিভি নিউজ’র যাত্রা শুরু

4

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের আহ্বান ডিআরইউয়ের

5

বুড়িচং–ব্রাহ্মণপাড়া সড়কে পানি জমে দুর্ভোগ ও অতিরিক্ত স্পিড ব

6

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি ও অপপ্রচার থেকে শিক্ষকদের বির

7

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে দাউদকান্দিতে নিসচার নতুন কমিটি ঘোষণা

8

সাংবাদিক হাফিজুর রহমান (এইচ আর শফিক)-এর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি

9

সেমিকন্ডাক্টর খাতের বিকাশে টাস্কফোর্স গঠন, সদস্য ১৩ জন

10

বিয়ের অনুষ্ঠানে বরকে হারিকেন উপহার, লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে

11

দাউদকান্দিতে ৮ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

12

বিদেশি অস্ত্রসহ মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মাওরা সোহেল’

13

জলাবদ্ধতার মধ্যেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অনার্স ফাইনাল পর

14

তিতাসে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে বাবার বিরুদ্ধে মামলা, আদালতে প

15

দাউদকান্দি মডেল থানার বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন মামলার মোট ৬ জন

16

কচুয়ায় বিশেষ অভিযানে ৮৮ পিস ইয়াবা ও ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ ৮ জন গ

17

আন্তর্জাতিক পলিসি ডিসকাশন কনফারেন্সে UCLA-তে বক্তব্য রাখলেন

18

স্ট্রোক রোগীকে চিকিৎসা ছাড়াই রেফারের অভিযোগ, ব্রাহ্মণপাড়া হা

19

প্রধান উপদেষ্টাকে মার্চে বেইজিং সফরে নিতে আগ্রহী চীন

20