আজকের কুমিল্লা মিডিয়া ২৪ সংবাদ
Cumilla Media 24
প্রকাশ : Jun ৩, ২০২৬ইং অনলাইন সংস্করণ

অপরাধ নয়, মানবিক সমাজ গড়ি জেগে উঠুক বিবেক, ফিরে আসুক মনুষ্যত্বের আলো-সেলিম রেজা সৌরভ

মোঃ শাহজাহান বাশার

বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত সময় অতিক্রম করছে। একদিকে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলার নানা পরিসংখ্যান, অবকাঠামোগত অগ্রগতি, প্রযুক্তির বিস্তার এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা আমরা শুনছি; অন্যদিকে প্রতিদিনের সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে একের পর এক অপরাধ, সহিংসতা, নির্যাতন ও নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র। শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, প্রতারণা এবং দুর্নীতির মতো ঘটনা যেন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সংবাদ নয়; বরং সমাজের দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হচ্ছে? কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সীমাবদ্ধতা কি এর জন্য দায়ী? নাকি সমস্যার শিকড় আরও গভীরে, মানুষের মনোজগতে, আমাদের সামাজিক ও নৈতিক চেতনার অবক্ষয়ে?

বাস্তবতা হলো, কোনো সমাজে যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে যায়, যখন মানুষ অন্যের কষ্টে ব্যথিত হওয়ার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে, যখন ব্যক্তিস্বার্থই হয়ে ওঠে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য—তখন সেই সমাজে অপরাধের বিস্তার অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। আজ আমরা সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।একটি দেশের উন্নয়নকে কেবল মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা আকাশছোঁয়া ভবনের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল মানুষের নৈতিকতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক সম্পর্কের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।

একজন শিশু যদি নিরাপদে বিদ্যালয়ে যেতে না পারে, একজন নারী যদি নিজের সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, একজন সাধারণ নাগরিক যদি ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তাহলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সমাজকে প্রকৃত অর্থে সুখী ও স্থিতিশীল করতে পারে না।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক। আমরা উন্নয়নের কাঠামো নির্মাণ করেছি, কিন্তু মানবিকতার ভিতকে শক্তিশালী করতে পারিনি। ফলে সমাজের নানা স্তরে অস্থিরতা ও অবক্ষয় দিন দিন বাড়ছে।মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে তার বিবেক, সহমর্মিতা, সততা এবং ন্যায়বোধ। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতা, ভোগবাদ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার বিস্তারের ফলে অনেকেই নিজেদের ভেতরের মানবিক সত্তাকে বিসর্জন দিতে শুরু করেছে।

আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অনেক সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করার পরিবর্তে মানুষ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। রাস্তায় দুর্ঘটনায় আহত একজন মানুষ পড়ে থাকলেও অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেন। প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আমরা অনেক সময় নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিই।

এই মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটলে কেবল আইন প্রয়োগ করে একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।দুর্নীতি আজ শুধু প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যখন ঘুষ গ্রহণকারী যেমন অপরাধী, তেমনি ঘুষ প্রদানকারীও পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তখন পুরো ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

দুর্নীতিকে যদি সমাজে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, যদি অবৈধ সম্পদের মালিকদের সামাজিক সম্মান দেওয়া হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম ভুল বার্তা পাবে। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু আইনি ব্যবস্থা নয়, সামাজিক ঘৃণা ও নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

অন্যায়কে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। সমাজকে এমন অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে অসততা লজ্জার এবং সততা গৌরবের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।একটি শিশুর জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার। শিশু তার বাবা-মায়ের কাছ থেকেই সততা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার শিক্ষা গ্রহণ করে।

দুঃখজনকভাবে আজ অনেক পরিবারে সন্তানদের ভালো মানুষ হওয়ার চেয়ে সফল মানুষ হওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষায় ভালো ফল, উচ্চ বেতন, চাকরি কিংবা অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি অনেক সময় অবহেলিত হয়ে পড়ে।

কিন্তু একজন সফল মানুষ যদি নৈতিক না হন, তবে তার সাফল্য সমাজের জন্য কল্যাণকর হয় না। তাই সন্তানদের শুধু প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার শিক্ষা নয়, বরং মানবিক, দায়িত্বশীল এবং বিবেকবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দিতে হবে।শিক্ষার উদ্দেশ্য কখনোই শুধু চাকরি পাওয়া নয়। শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

বর্তমান সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকাংশে পরীক্ষানির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা তথ্য মুখস্থ করছে, কিন্তু নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকদেরও কেবল পাঠদানকারী নয়, আদর্শ নির্মাতা হিসেবে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে হবে।

একজন ভালো শিক্ষক শত শত শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারেন। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মানবিকতার চর্চাও সমানভাবে জরুরি।বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সাহিত্য, নাটক, সংগীত, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের মনকে পরিশীলিত করে, সহনশীলতা শেখায় এবং সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে।

একসময় পাড়া-মহল্লার লাইব্রেরি, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ক্রীড়া ক্লাব তরুণদের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু বর্তমানে এসব কার্যক্রম অনেক জায়গায় হারিয়ে যাচ্ছে।

এর পরিবর্তে মাদক, সহিংসতা, অনলাইন আসক্তি এবং অসুস্থ বিনোদন তরুণদের একটি অংশকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে নতুনভাবে শক্তিশালী করতে হবে।প্রতিটি ধর্ম মানুষকে সত্য, ন্যায়, সততা এবং মানবকল্যাণের শিক্ষা দেয়। ধর্মের মূল চেতনা কখনো ঘৃণা, সহিংসতা কিংবা অন্যায়ের পক্ষে নয়।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিয়মিতভাবে দুর্নীতি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সামাজিক অপরাধ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক ভূমিকা পালন করে, তাহলে তা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

ধর্মীয় শিক্ষা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা মানুষের আচরণে প্রতিফলিত হয় এবং তাকে একজন উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ। তবে শুধু অপরাধের খবর প্রকাশ করাই গণমাধ্যমের একমাত্র দায়িত্ব নয়।

সমাজে যারা সততা, মানবতা এবং নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে ইতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করছেন, তাদের গল্পও সামনে আনতে হবে। ইতিবাচক রোল মডেল তুলে ধরলে নতুন প্রজন্ম ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত হবে।

গণমাধ্যম যদি অপরাধের পাশাপাশি মানবিকতার জয়গাথাও প্রচার করে, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের গতি আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।আমরা প্রায়ই রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন কিংবা সমাজের সমালোচনা করি। কিন্তু খুব কম মানুষ নিজের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি।

বাস্তবতা হলো, সমাজ পরিবর্তনের শুরু ব্যক্তিগত পরিবর্তন থেকেই। ঘুষ না দেওয়া, আইন মেনে চলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো, অসহায় মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসা—এসব ছোট ছোট কাজই একটি বৃহৎ পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

মহাদেশ যেমন অসংখ্য বালুকণার সমষ্টি, তেমনি একটি সুন্দর সমাজও অসংখ্য সৎ মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল।আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, নৈতিক পুনর্জাগরণ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে অবশ্যই অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে মানবিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করাও জরুরি।

আমাদের প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে—একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা নৈতিক, মানবিক এবং দায়িত্বশীল হন।

আসুন, আমরা ঘৃণা নয়, ভালোবাসা ছড়াই; অন্যায় নয়, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াই; স্বার্থপরতা নয়, মানবিকতাকে বেছে নিই। জেগে উঠুক আমাদের বিবেক, ফিরে আসুক মনুষ্যত্বের আলো।

লেখক: সেলিম রেজা সৌরভ

অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, বুড়িচং, কুমিল্লা।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শহিদ নগর এমএ জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির প্রথম সভা অনুষ

1

ব্রাহ্মণপাড়ায় বিশেষ অভিযান: গাঁজা গাছসহ যুবক গ্রেপ্তার, মা

2

দাউদকান্দিতে ফ্রি ফায়ার খেলায় বাধা দেওয়ায় স্বামীর আত্মহত্যা

3

দেড় থেকে দুই কোটি মানুষকে টিসিবির পণ্য দেওয়া সম্ভব: বাণিজ্য

4

বাড়ির দোতলায়ও পানি, ভাই–বোনের খোঁজ পাচ্ছেন না গায়িকা পুতুল

5

শাপলা চত্বর ও ক্রসফায়ার মামলায় সাবেক আইজিপি মামুনকে আসামির ত

6

সংসদে জ্বালানি সংকট অস্বীকার, দাম সমন্বয়ের ব্যাখ্যা দিলেন স্

7

ভারতের সঙ্গে কথা হবে চোখে চোখ রেখে

8

প্রবাসে ট্যাক্সিচালক, দেশে শিক্ষার স্থপতি — মোশারফ হোসেনের ব

9

কবি নজরুল স্মারক সম্মাননা’ পেলেন শিক্ষার আলোকবর্তিকা মোশাররফ

10

গৌরীপুর বাজারে ‘খাজনার চাপ’ ব্যবসায়ীদের অনুপস্থিতিতে ফাঁকা স

11

শরীয়তপুর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি পলাশ, সম্পাদক মামুন

12

অসুস্থ মানসিকতা পরিবর্তন না করে কীভাবে দেশ ও জাতি পরিবর্তন হ

13

সিদ্ধিরগঞ্জে যৌথ অভিযানে ৫০০ গ্রাম গাঁজাসহ ৬ মাদক ব্যবসায়ী গ

14

কুমিল্লার শ্রেষ্ঠ ইউএনও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্

15

দাউদকান্দিতে তিন দিনব্যাপী ভূমিসেবা মেলার উদ্বোধন

16

হোমনায় নাগরিক সংবর্ধনায় সেলিম ভূঁইয়া এমপির ফুলের টাকা দুস্থদ

17

দাউদকান্দিতে শিশু রিফাত হত্যার বিচারের দাবিতে এলাকাবাসীর মান

18

উন্নত জীবনের আশায় সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ফিরল না আর ২৫০ প্রা

19

মেহেরবানি করে চাঁদাবাজি করবেন না, রাজশাহীতে কর্মী সম্মেলনে জ

20