কক্সবাজার উপকূলজুড়ে এখন অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর কান্নার এক দীর্ঘ সময়। শতাধিক পরিবার দিন গুনছে একটি খবরের আশায়। প্রিয়জন বেঁচে আছে কি না, সেই উত্তরই এখন তাদের একমাত্র চাওয়া।
সম্প্রতি আন্দামান সাগরে একটি ট্রলারডুবির ঘটনায় নারী, শিশু ও রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২৫০ থেকে ২৮০ জন নিখোঁজ হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। বেঁচে ফেরা কয়েকজনের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ সেই যাত্রার চিত্র। পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৪ এপ্রিল উখিয়া, ইনানী ও টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ছোট নৌকায় করে শত শত মানুষকে একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। ট্রলারটির নাম ছিল ‘তানজিনা সুলতানা’। গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। উন্নত জীবনের স্বপ্নে অনেকেই দালালচক্রের প্রলোভনে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় সামিল হন। কিন্তু যাত্রার ছয় দিনের মাথায়, ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়।বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা যুবক রফিকুল ইসলাম জানান, ট্রলারটিতে গাদাগাদি করে মানুষ তোলা হয়েছিল। দাঁড়ানোর মতো জায়গাও ছিল না। ঝড়ের আঘাতে হঠাৎ ট্রলারটি ডুবে যায় এবং অনেকেই সাগরে ভেসে থাকতে বাধ্য হন। পরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের উদ্ধার করে।
আরেক রোহিঙ্গা যুবক ইমরান বলেন, ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় তারা যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, ৯ এপ্রিল সাগরে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করা হয়। পরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ১৩ এপ্রিল তাদের কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি এবং তিনজন রোহিঙ্গা। তবে ট্রলারে থাকা যাত্রীদের সঠিক তালিকা না থাকায় নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সংস্থাগুলোর মতে, এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি, সীমিত সুযোগ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের একটি নির্মম প্রতিফলন।ঘটনার পর কক্সবাজারের টেকনাফ ও পেকুয়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লেঙ্গুর বিল এলাকার ২৭ বছর বয়সী মোস্তাক আহমদ তিন বছর আগে বিয়ে করেন। তার দেড় বছরের একটি সন্তান রয়েছে। কৃষিকাজে কোনোমতে চলা সংসার ছেড়ে উন্নত জীবনের আশায় যাত্রা করেছিলেন তিনি।
পরিবারের দাবি, দালালরা প্রথমে তার কাছে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে তা কমিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় নামিয়ে আনে। কিন্তু টাকা জোগাড়ের আগেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। সর্বশেষ ফোনে তিনি শুধু বলেছিলেন, ‘দোয়া করো’। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই।মোস্তাকের স্ত্রী ইসমত আরা বলেন, একটি খবর পেলেও তারা শান্তি পেতেন। তার বোন ছাদেকাও ভাইয়ের ছবি আঁকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।একই চিত্র দেখা গেছে পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়ারপাড়া গ্রামে। বেলাল উদ্দিন ১২ দিন ধরে নিখোঁজ। তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আয়েশা বেগম দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। তিনি বলেন, স্বামী বেঁচে আছেন নাকি সাগরে ডুবে গেছেন, কিছুই জানেন না। এমন পরিস্থিতিতে কক্সবাজার উপকূলের বহু পরিবার থানায়, জনপ্রতিনিধিদের কাছে ছুটছেন। কিন্তু এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য মিলছে না। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের অভিযোগ, এই ঘটনার পেছনে একটি শক্তিশালী মানবপাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে শাকের মাঝি, হায়দার আলী, আব্দুল আমিন, সৈয়দ উল্লাহ, মো. ইব্রাহীম, আজিজুল হক, মোস্তাক আহমদ, নুরুল কবির বাদশা, মোহাম্মদ উল্লাহ ও মোজাহের মিয়াসহ একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত সাতটি রুট ব্যবহার করে নিয়মিত মানবপাচার চালানো হচ্ছে। ঘটনার পর বেশিরভাগ দালাল আত্মগোপনে রয়েছে বলেও জানা গেছে। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সামাজিক সংগঠন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, এই ট্রলারডুবি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি শত শত মানুষের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিয়েছে। ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন অভিযোগ করেন, কক্সবাজার উপকূল থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত সমুদ্রপথে পাচার কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই চলছে। কিন্তু কার্যকরভাবে তা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, মানবপাচার বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রয়োজনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
বর্তমানে কক্সবাজার উপকূলের প্রতিটি বাড়ি যেন এক একটি অপেক্ষার স্থান। কেউ এখনো আশা ছাড়েননি। কেউ আবার নিঃশব্দে বুঝে নিয়েছেন, প্রিয়জনের আর ফেরা নাও হতে পারে।
মোঃ শাহরিয়া। বিশেষ প্রতিনিধি