নিউজ ডেস্ক
পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটির নাম হয়তো কোনো ঘর নয়, কোনো প্রাসাদ নয়, কোনো ব্যাংকের নিরাপদ ভল্টও নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো মায়ের আঁচল। সেখানে লুকিয়ে থাকলে ভয়কে ভয় মনে হয় না, অভাবকে অভাব মনে হয় না, পৃথিবীর হাজারো কষ্টও যেন একটু দূরে সরে যায়। ছোটবেলায় আমরা জানতাম না মায়ের আঁচলের ভাঁজে কতটা মায়া জমে থাকে। জানতাম না, সেই আঁচলের নিচে লুকিয়ে থাকে একজন নারীর হাজারো না-বলা কষ্ট, না-পাওয়া স্বপ্ন আর সন্তানের জন্য নিঃশব্দ আত্মত্যাগের গল্প। অভাবের সংসারে মায়ের ভালোবাসা হয়তো সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়। ঘরে চাল কম, বাজারের ব্যাগ প্রায় খালি, বাবার আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন—তবু সন্তান যখন বলে, “মা, আজ এটা খাব”, মা কোনো হিসাব করেন না। নিজের পছন্দের খাবারটি সন্তানের প্লেটে তুলে দিয়ে হাসতে হাসতে বলেন, “আমি তো এগুলো খাই না।” সন্তান তখন বিশ্বাস করে। সে জানে না, মা আসলে খেতে চেয়েছিলেন। শুধু সন্তানের মুখের হাসিটা দেখার জন্য নিজের ইচ্ছেটাকে গিলে ফেলেছেন। একটি মায়ের জীবন এমনই। তিনি নিজের প্রয়োজনকে কখন যে সন্তানের প্রয়োজনের নিচে নামিয়ে রাখেন, তার কোনো হিসাব থাকে না। নতুন শাড়ি কেনার ইচ্ছা থাকলেও সন্তানের স্কুলের বেতন বাকি থাকলে শাড়ি আর কেনা হয় না। নিজের জন্য ভালো খাবার কিনতে ইচ্ছে করলেও সন্তানের পরীক্ষার ফি দিতে হবে বলে সেই টাকা জমিয়ে রাখেন। নিজের শরীর খারাপ হলেও বলেন, “আমার কিছু হয়নি।” কারণ তিনি জানেন, তিনি অসুস্থ হলে সংসারের কাজ থেমে যাবে; কিন্তু সন্তান অসুস্থ হলে তার নিজের পৃথিবীটাই থেমে যায়। শৈশবের সেই দিনগুলো মনে পড়ে। বৃষ্টির রাতে টিনের চালের ওপর টুপটাপ শব্দ। ঘরের এক কোণে ছোট্ট বিছানা। বাইরে অন্ধকার। বিদ্যুৎ নেই। মা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। নিজের ঘুমের কথা ভুলে সন্তানের কপালে হাত রেখে দেখছেন জ্বর কমেছে কি না। সন্তান ঘুমিয়ে গেলে মা একটু চোখ বন্ধ করেন। আবার শিশুটি নড়েচড়ে উঠলে সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠেন। তখন আমরা বুঝতাম না—একজন মা কতটা ক্লান্ত হয়েও কীভাবে সন্তানের জন্য রাতের পর রাত জেগে থাকতে পারেন। মা কখনো তার কষ্টের গল্প বলেন না। তিনি বলেন না, আজ সারাদিন না খেয়ে ছিলেন। বলেন না, শরীরটা ভালো নেই। বলেন না, তারও নতুন কাপড় পরতে ইচ্ছে করে। বলেন না, তিনিও একদিন দূরের কোনো শহর দেখতে চেয়েছিলেন। বলেন না, তারও কিছু স্বপ্ন ছিল। শুধু বলেন—“তুই ভালো থাকিস।” এই একটি বাক্যের মধ্যে একজন মায়ের পুরো জীবন লুকিয়ে থাকে। একসময় সন্তান বড় হয়। যে সন্তান মায়ের আঁচল ধরে হাঁটতে শিখেছিল, সে একদিন মায়ের হাত ছেড়ে নিজের পৃথিবী তৈরি করতে শুরু করে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি, সংসার—জীবনের ব্যস্ততা তাকে ধীরে ধীরে মায়ের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়। মায়ের আঁচলটি তখনও একই জায়গায় থাকে, কিন্তু সন্তানটির ফেরার সময় কমে যায়। ফোন আসে কম। কথা হয় কম। দেখা হয় আরও কম। মা অবশ্য অপেক্ষা করেন। তিনি কখনো বলেন না—“তুই আমাকে সময় দিস না।” শুধু ফোনের রিং শুনলেই ছুটে আসেন। “হ্যালো, বাবা, কেমন আছিস?” ওপাশ থেকে ব্যস্ত কণ্ঠ—“ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছ?” মা একটু হাসেন। “আমি ভালো আছি বাবা।” তারপর সন্তান বলে—“মা, পরে কথা বলি। একটু ব্যস্ত আছি।” ফোন কেটে যায়। মা কিছুক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে সেটি পাশে রেখে দেন। তিনি জানেন, সন্তান ব্যস্ত। তবু মায়ের মন কি আর যুক্তি বোঝে? একসময় যে মা সন্তানের জন্য সারারাত জেগে থাকতেন, সেই মা-ই একদিন সন্তানের একটি ফোনকলের অপেক্ষায় সারারাত জেগে থাকেন। এটাই জীবনের সবচেয়ে নির্মম পরিহাস। ছোটবেলায় সন্তান জ্বর হলে মা কপালে হাত রাখতেন। বড় হয়ে মা অসুস্থ হলে সন্তান ফোনে জিজ্ঞেস করে—“ওষুধ খেয়েছ?” মা বলেন—“হ্যাঁ বাবা।” কিন্তু অনেক সময় ওষুধ খাওয়ার চেয়েও মায়ের বেশি প্রয়োজন হয় সন্তানের পাশে বসে থাকা। মা সেটা বলেন না। কারণ মা চাওয়া শিখেননি। মা শুধু দিতে শিখেছেন। নিজের স্বপ্ন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন সাজাতে শিখেছেন। নিজের ঘুম দিয়ে সন্তানের ঘুম কিনতে শিখেছেন। নিজের ক্ষুধা দিয়ে সন্তানের পেট ভরাতে শিখেছেন। নিজের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফুটাতে শিখেছেন। অভাবের সংসারে মায়ের আত্মত্যাগ সবচেয়ে নীরব। বাবার পকেটে টাকা নেই। বাজার থেকে কম চাল এসেছে। ঘরে হয়তো মাছ মাত্র এক টুকরো। মা সেটি সন্তানের প্লেটে তুলে দেন। সন্তান বলে—“মা, তুমি খাবে না?” মা হেসে বলেন—“আমার মাছ ভালো লাগে না।” শিশুটি বিশ্বাস করে। বছর কেটে যায়। সন্তান বড় হয়। একদিন হয়তো সে বুঝতে পারে—মা মাছ পছন্দ করতেন। শুধু নিজের ভাগের মাছটুকু তিনি সন্তানের জন্য রেখে দিতেন। এই ছোট ছোট ত্যাগের কোনো সংবাদ হয় না। কোনো পত্রিকায় শিরোনাম হয় না। কোনো পুরস্কার দেওয়া হয় না। কোনো মঞ্চে মায়ের নাম ঘোষণা করা হয় না। তবু একটি মানুষের পুরো জীবন গড়ে ওঠে এই অদৃশ্য আত্মত্যাগের ওপর। মা কখনো নিজের পুরোনো শাড়ির কথা বলেন না। সন্তানের নতুন জামা হলে তিনি খুশি হন। সন্তানের নতুন জুতা হলে তিনি আনন্দ পান। সন্তানের হাতে নতুন মোবাইল দেখলে হাসেন। সন্তান বিদেশে গেলে গর্ব করে বলেন—“আমার ছেলে বিদেশে থাকে।” কেউ জানে না, সেই ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য মা হয়তো নিজের শেষ সঞ্চয়টুকুও দিয়েছিলেন। কেউ জানে না, বিমানবন্দরে বিদায়ের সময় হাসিমুখে হাত নেড়ে ফিরে এসে তিনি ঘরের দরজা বন্ধ করে কেঁদেছিলেন। কেউ জানে না, সন্তানের পাঠানো ছবিগুলো তিনি কতবার দেখেন। কেউ জানে না, রাতে ঘুমানোর আগে তিনি সন্তানের পুরোনো জামাটি আলমারি থেকে বের করে কতক্ষণ হাতে নিয়ে বসে থাকেন। কারণ মায়েরা সন্তানকে দূরে পাঠাতে পারেন, কিন্তু মন থেকে কখনো দূরে পাঠাতে পারেন না। একদিন সন্তান বাড়ি ফিরে আসে। মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকেন। চোখে আনন্দ, মুখে হাসি, হাতে হয়তো রান্নাঘরের কাজের গন্ধ। তিনি বলেন—“আয় বাবা, তোর জন্য কত কী রান্না করেছি!” সন্তান হয়তো বলে—“মা, এত কিছু করার কী দরকার ছিল?” মা হাসেন। “তুই আসবি, আর আমি কিছু রান্না করব না—তা কি হয়?” সন্তান হয়তো বুঝতে পারে না, তার আসার খবর পাওয়ার পর থেকেই মায়ের ঘরে যেন উৎসব শুরু হয়ে গেছে। মা বাজার করেন, রান্না করেন, ঘর গোছান, পুরোনো বিছানার চাদর বদলে দেন, সন্তানের পছন্দের খাবার তৈরি করেন। তারপর সন্তান খাওয়া শুরু করলে মা পাশে বসে তাকিয়ে থাকেন। নিজে খান না। শুধু বলেন—“আর একটু নে।” এই “আর একটু নে” কথাটির মধ্যেও মায়ের ভালোবাসার সমুদ্র লুকিয়ে থাকে। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। যে মা একসময় দ্রুত হাঁটতেন, তিনি একদিন ধীরে হাঁটেন। যে মা একসময় সন্তানের পেছনে ছুটতেন, তিনি একদিন লাঠিতে ভর দেন। যে চোখে একসময় সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল, সেই চোখে একদিন চশমা ওঠে। চুলে সাদা রং নামে। হাতে কাঁপুনি আসে। কণ্ঠস্বর ধীরে যায়। তবু সন্তানের জন্য দোয়া থামে না। মা বৃদ্ধ হন, কিন্তু সন্তানের জন্য তার ভালোবাসা কখনো বৃদ্ধ হয় না। আমরা বড় হতে হতে অনেক কিছু শিখি। অর্থ উপার্জন করতে শিখি। বড় বাড়ি করতে শিখি। গাড়ি কিনতে শিখি। বিদেশ ভ্রমণ করতে শিখি। ব্যবসা করতে শিখি। কিন্তু অনেক সময় ভুলে যাই—মায়ের পাশে বসে পাঁচ মিনিট কথা বলতে। আমরা মায়ের জন্য দামি শাড়ি কিনি, কিন্তু সময় কিনে দিতে পারি না। মায়ের জন্য ওষুধ কিনি, কিন্তু ওষুধ খেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করার সময় পাই না। মায়ের জন্য টাকা পাঠাই, কিন্তু তার একাকিত্বের কাছে বসি না। অথচ মা হয়তো টাকা চান না। তিনি চান তার সন্তান একদিন এসে বলুক—“মা, কেমন আছ?” তারপর একটু পাশে বসুক। মায়ের হাতটা ধরুক। মায়ের কপালে হাত রাখুক। মা হয়তো কিছুই বলবেন না। শুধু মৃদু হাসবেন। সেই হাসির মূল্য পৃথিবীর কোনো অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা যায় না। মায়ের আঁচল আসলে একটি ছোট পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে সন্তানের জন্য কোনো হিসাব নেই। সেখানে অভাব আছে, কিন্তু অভিযোগ নেই। কষ্ট আছে, কিন্তু কান্না নেই। ত্যাগ আছে, কিন্তু তার কোনো হিসাব নেই। ভালোবাসা আছে—শুধু ভালোবাসা। আমরা পৃথিবীর অনেক জায়গায় নিরাপত্তা খুঁজি। টাকা জমাই, বাড়ি বানাই, সম্পদ করি, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করি। কিন্তু শৈশবে আমাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ছিল মায়ের আঁচল। ভয় পেলে সেখানে লুকাতাম, কাঁদলে সেখানে মুখ লুকাতাম, অসুস্থ হলে সেখানে মাথা রাখতাম, কষ্ট পেলে মাকে বলতাম। আজ আমরা বড় হয়ে গেছি। কিন্তু মায়ের কাছে আমরা আজও সেই ছোট্ট শিশুটিই রয়ে গেছি। তাই মা বেঁচে থাকতে তার কাছে ফিরে যান। তার সঙ্গে কথা বলুন। তার গল্প শুনুন—যে গল্প হয়তো আপনি শতবার শুনেছেন। তার হাতের রান্না খান। তার পুরোনো কথায় বিরক্ত না হয়ে হাসুন। কারণ একদিন হয়তো সেই কণ্ঠটি আর শোনা যাবে না। একদিন ফোনের ওপাশে আর কেউ বলবে না—“খেয়েছিস বাবা?” একদিন দরজা খুলে কেউ বলবে না—“আয়, তোর জন্য রান্না করেছি।” একদিন ঘরের কোনো এক কোণে পড়ে থাকবে মায়ের চশমা, পুরোনো শাড়ি, নামাজের জায়নামাজ কিংবা প্রিয় কোনো কাপড়। সব থাকবে, শুধু মা থাকবেন না। তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ দিয়েও আপনি মায়ের একটি ডাক কিনতে পারবেন না। তাই আজই মায়ের কাছে ফিরে যান। মায়ের হাতটা ধরে বলুন—“মা, তুমি পাশে থাকলেই আমার পৃথিবী পূর্ণ।” কারণ পৃথিবী যত বড়ই হোক, জীবন যত ব্যস্তই হোক, মানুষ যত দূরেই চলে যাক—শেষ পর্যন্ত হৃদয় যখন আশ্রয় খোঁজে, তখন সে ফিরে যেতে চায় সেই এক জায়গায়—মায়ের আঁচলে। সেই আঁচলেই লুকিয়ে থাকে শৈশব, সেই আঁচলেই লুকিয়ে থাকে নিরাপত্তা, সেই আঁচলেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আর একদিন যখন সেই আঁচলটি চিরদিনের জন্য সরে যাবে, তখন বুঝবেন—মা শুধু একজন মানুষ ছিলেন না; মা ছিলেন আমার পুরো পৃথিবী।
লেখক: মোঃ শাহজাহান বাশার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।