কুমিল্লা শহর থেকে নিখোঁজ হওয়া চার স্কুলছাত্রীকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র ধরে তারা বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। পরে ঢাকায় পরিকল্পনা সফল না হওয়ায় তারা হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিক্রি করা একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। মোবাইলটি কিনেছেন এমন একজনকে আটক করেছে পুলিশ। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থীরা হলো কুমিল্লা পুলিশ লাইন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইশা আক্তার (১২), ঝুমুর (১২), সোনিয়া (১৩) এবং মাইশার ছোট বোন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাত (৮)।
‎
‎পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১২ অক্টোবর সকালে চার শিক্ষার্থী স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজ নিজ বাসা থেকে বের হয়। তবে তারা কেউই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়নি। বিকেলে বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতে শুরু করা হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি কুমিল্লার পুলিশ সুপারকে জানানো হয়। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ সুপারের নির্দেশে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কোতোয়ালি থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অনুসন্ধানে নামে। পুলিশ নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের থানায় ডেকে বিষয়টি জানায়। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের সন্ধানে বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শুরু করে পুলিশ। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন থানায় বিষয়টি জানিয়ে নিখোঁজ চার শিক্ষার্থীর ছবি সংযুক্ত করে বেতার বার্তা পাঠানো হয়।
‎
‎পুলিশের অনুসন্ধান ও সমন্বিত প্রচেষ্টার একপর্যায়ে ১২ অক্টোবর দিবাগত রাত পেরিয়ে ১৩ অক্টোবর রাত আনুমানিক ২টার দিকে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট থানা এলাকা থেকে চার শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় চুনারুঘাট থানা পুলিশ সহায়তা করে। উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থীদের নিরাপদে নিজেদের হেফাজতে নেয় জেলা গোয়েন্দা শাখা ও কোতোয়ালি থানা পুলিশের সদস্যরা। পরে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসাবাদে তাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে শিক্ষার্থীরা জানায়, পড়াশোনার প্রতি তাদের তেমন আগ্রহ ছিল না। তারা নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করত এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। পাশাপাশি টিকটকে ভিডিও আপলোড করত তারা। এসব মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও সখ্যতা গড়ে ওঠে।
‎
‎জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাইশা আক্তারের সঙ্গে আবু হুজাইফা, মারজান, হৃদয় ও জিসান নামের কয়েকজনের পরিচয় হয়। সোনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে সুজন ও মিনহাজ নামের দুজনের। অন্যদিকে ঝুমুরের সঙ্গে মোফাজ্জল ও শোয়েব নামের দুজনের পরিচয় হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত হলেও এসব ছেলের প্রকৃত ঠিকানা সম্পর্কে তারা অবগত ছিল না বলে পুলিশকে জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, যোগাযোগ এবং সেখান থেকে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ধারণা ও আকর্ষণের প্রভাবে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ছাড়ার পরিকল্পনা করে। এ উদ্দেশ্যে তারা বাসা থেকে মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে বের হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাড়ি ছাড়ার পর তারা কুমিল্লা শহরের বাহার মোবাইল মার্কেটে যায়। সেখানে মাইশা তার পরিবারের ব্যবহৃত একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ৪ হাজার টাকায় বিক্রি করে। পরে ওই টাকা নিয়ে তারা প্রথমে ঢাকায় যায়। তাদের পরিকল্পনা ছিল, ঢাকায় গিয়ে নিজেরা উপার্জন করবে, স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ছেলেদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করবে।
‎
‎তবে ঢাকায় গিয়ে তাদের পরিকল্পনা সফল হয়নি বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। পরে তারা ঝুমুরের দাদাবাড়ি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী তারা চুনারুঘাট এলাকায় পৌঁছায়। পরে পুলিশের অনুসন্ধানের মাধ্যমে সেখান থেকেই চার শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়। এদিকে নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের সন্ধানের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র উদ্ধারে অভিযান চালায় পুলিশ। মাইশার বিক্রি করা মোবাইল ফোনটি কুমিল্লা শহরের বাহার মার্কেট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মোবাইল ফোনটি কিনেছেন এমন একজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের সমন্বিত অনুসন্ধান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন থানার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে চার শিক্ষার্থীর অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ঘটনায় উদ্ধার হওয়া চার শিক্ষার্থীকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
‎
‎প্রতিবেদক: মোঃ শাহরিয়া সিকদার