কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা খাদিশিল্প আজ নানা সংকটের মুখে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের সরবরাহ, পরিবর্তিত বাজারব্যবস্থা এবং আধুনিক বিপণনব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জের কারণে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিনের এ ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উৎপাদক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস। তিনি বলেছেন, কুমিল্লার খাদি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ শিল্পকে রক্ষা করা না গেলে খাদি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে কাগজে-কলমে স্বীকৃতি পেলেও বাস্তবে এর উৎপাদন ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই খাদিশিল্পের সংকট চিহ্নিত করে উৎপাদক ও শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি শিল্পটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার খাদিপল্লি হিসেবে পরিচিত বড়কামতা গ্রামে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) আয়োজিত ‘হাতে বোনা খাদি ও কুমিল্লা: সংকট ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ড. সায়মা ফেরদৌস বলেন, কুমিল্লার খাদি শুধু একটি কাপড় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা। স্থানীয় তাঁতি, সুতা প্রস্তুতকারী, সুতা কাটার কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। তাঁদের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে খাদিশিল্পের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে বাজারব্যবস্থা ও ভোক্তাদের চাহিদায় পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদিশিল্পকে এগিয়ে নিতে উৎপাদনব্যবস্থা, কাঁচামাল সংগ্রহ, পণ্যের মান এবং বিপণন কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনকারীদের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর কার্যকর সমাধান বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।তিনি আরও বলেন, ঐতিহ্যবাহী খাদিশিল্পের সংকট মোকাবিলায় শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বললে চলবে না। শিল্পটির সঙ্গে যুক্ত মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, উৎপাদনকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে খাদিকে আরও কার্যকরভাবে বাজারজাত করা গেলে এ শিল্পের সম্ভাবনা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সেমিনারে বিশেষভাবে সুতা কাটার কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিক, খাদি কাপড় উৎপাদনকারী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অবদানের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। খাদি উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের শ্রম ও দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ উৎপাদন প্রক্রিয়ার নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সমস্যাগুলো উন্নয়ন পরিকল্পনায় যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ড. সায়মা ফেরদৌস মনে করেন, খাদিশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতামত ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে। পাশাপাশি উৎপাদনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করা, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে শিল্পটির বিকাশের পথ তৈরি করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কুমিল্লার খাদি একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিতি বহন করে আসছে।
এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং ঐতিহ্যভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা। ফলে খাদিশিল্পের সংকট শুধু একটি পণ্যের উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যা নয়, এর সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি ও বহু মানুষের জীবিকার বিষয়টিও জড়িত। এ কারণে শিল্পটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বার্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বার্ডের পরিচালক (গবেষণা) ড. শেখ মাসুদুর রহমান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বার্ডের পরিচালক (প্রশাসন) আইরিন সুলতানা, দেবিদ্বার উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ ফয়সাল উদ্দিন, কুমিল্লা খাদি ঘরের স্বত্বাধিকারী বাবু প্রদীপ কুমার রাহা, ফ্যাশন ডিজাইনার ফাইকুজ্জামান বাদশাহ এবং তাঁত বোর্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী আইয়ুব আলীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সেমিনারে খাদি কাপড় উৎপাদনকারী, সুতা কাটার কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিক, তুলা সরবরাহকারী ও উদ্যোক্তারা অংশ নেন। তাঁরা খাদি উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা, কাঁচামাল সরবরাহের চ্যালেঞ্জ এবং শিল্পটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিভিন্ন দিকও আলোচনায় উঠে আসে। আলোচনায় খাদিশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। উৎপাদক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য সমাধান বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের বিপণন ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগও শিল্পটির অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কুমিল্লার খাদিশিল্পকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি উৎপাদনব্যবস্থার উন্নয়ন, কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা, আধুনিক
প্রতিবেদক: মোঃ শাহরিয়া সিকদার