মোঃ শাহজাহান বাশার

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে হোটেল কর্মচারী রাসেল মিয়া (৩৮) হত্যার রহস্য দেড় বছর পর উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রথমে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও পিবিআইয়ের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পাওনা ৩৫ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে রাসেলকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতনের পর হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানোর অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় মো. কালু মিয়া (২৮) নামে এক সন্দেহভাজন আসামিকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরও কয়েকজনের নাম পেয়েছে তদন্তকারী দল।

মামলা সূত্রে জানা যায়, সরিষাবাড়ী পৌরসভার আরামনগর বাজারে হোটেল কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন রাসেল মিয়া। ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। পরদিন ২০ মার্চ সকাল ৮টার দিকে আরামনগর বাজারের দুধহাটি এলাকায় হাফিজুর রহমানের চায়ের দোকানঘরের ভেতরে বাঁশের ধন্নার সঙ্গে গলায় রশি দেওয়া ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার পর রাসেলের মা মোছা. মেহেনারা খাতুন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে সরিষাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটির নম্বর ০৭, তারিখ ২১ মার্চ ২০২৫; ধারা ৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোড।

প্রথমে সরিষাবাড়ী থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে একজন সন্দিগ্ধ আসামিকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকার নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআই জামালপুর জেলার ওপর ন্যস্ত হয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআইয়ের এসআই সুমন আহমেদ।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১১ আগস্ট সরিষাবাড়ী থানাধীন আরামনগর এলাকা থেকে কালু মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি সরিষাবাড়ীর বেপারীপাড়া এলাকার মৃত বেলাল মিয়ার ছেলে।

পিবিআই জানায়, গত ২৩ আগস্ট রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে কালু মিয়া হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। একই সঙ্গে তিনি সোহেলসহ আরও কয়েকজনের নাম প্রকাশ করেন। পরে তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তদন্তে পিবিআই আরও জানতে পারে, ঘটনার কিছুদিন আগে রাসেল মিয়া সোহেলের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। ওই টাকা ফেরত দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য সোহেল বিভিন্ন সময় রাসেলকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, ঘটনার দিন সোহেল তার এক বন্ধুর মাধ্যমে রাসেলকে নির্জন স্থানে ডেকে নেন। সেখানে কালু মিয়াসহ অন্যদের সহযোগিতায় রাসেলকে মারধর ও নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর মুখে কাপড় ঢুকিয়ে এবং পায়ুপথে মদের বোতল প্রবেশ করিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।

পরে হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর উদ্দেশ্যে রাসেলের হাত-পা বেঁধে তাকে আরামনগর বাজারের ওই চায়ের দোকানঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গলায় রশি দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে।

এদিকে, মামলায় জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান এবং তদন্ত শেষে এ বিষয়ে আদালতে পরবর্তী প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসা এসব অভিযোগ আদালতে বিচারাধীন; অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিদের দোষ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তারা আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।