নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ভরাসার বাজারের প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো একটি বটগাছ অনুমোদন ছাড়াই কাটার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। গাছটির কয়েকটি বড় ডাল কেটে ফেলার সময় খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হোসেনের হস্তক্ষেপে গাছ কাটা বন্ধ করা হয়। বর্তমানে ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় দেড়শ বছর আগে এই বটগাছকে কেন্দ্র করেই ভরাসার বাজারের গোড়াপত্তন হয়। বর্তমানে গাছটির নিচে ও আশপাশের সরকারি (খাস) ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গাজুড়ে প্রায় ৩৬০টি দোকানপাট ও হাটবাজার গড়ে উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাজারের খাসজমি দখল করে বিভিন্ন হোটেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। তাদের দাবি, ব্যক্তিস্বার্থে সরকারি জায়গায় থাকা এই ঐতিহ্যবাহী বটগাছটি অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং এর কয়েকটি বড় ডালও কেটে ফেলা হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে একাধিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদি গাছটি সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে, তবে বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না নিয়ে কেন তা কাটার উদ্যোগ নেওয়া হলো? বাজার পরিচালনা কমিটিকে বিষয়টি কেন অবহিত করা হয়নি? সরকারি জায়গায় থাকা একটি শতবর্ষী গাছ কাটার আইনগত ক্ষমতা কার? আর গাছটি অপসারণের পেছনে শুধুই জননিরাপত্তার কারণ ছিল, নাকি অন্য কোনো স্বার্থও জড়িত—এমন প্রশ্নও তুলছেন অনেকেই।
সচেতন নাগরিকদের মতে, ভরাসার বাজারের পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই বটগাছ। এটি শুধু একটি গাছ নয়; বরং এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গাছটি কেটে ফেললে বাজারের নান্দনিকতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গাছ কাটার আগে ষোলনল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে লিখেন, “ভরাসার বাজারের পুরোনো বটগাছটি মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ছিল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।” একই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, বুড়িচং উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম টিপু বাজার পরিদর্শন করে গাছটি কাটার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে বাজার পরিচালনা কমিটির কমান্ডার বাহার মিয়া ও যুগ্ম সম্পাদক রতন তালাশ বলেন, “গাছটি অনেক পুরোনো। এর ছায়াতেই বাজার গড়ে উঠেছে। কারা বড় ডালগুলো কেটেছে আমরা জানি না। তবে পুরো গাছ কেটে ফেললে বাজারের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে।”
ষোলনল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সালেহ আহমেদ বলেন, “বটগাছটির কারণে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে রয়েছেন। যে কোনো সময় গাছটি ভেঙে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আমরা গাছটি কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং কয়েকটি ডাল কেটেছি।”
অন্যদিকে বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বটগাছ কাটার বিষয়ে আমাকে কেউ অবগত করেনি। কী কারণে গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিও আমার জানা নেই।”
বুড়িচং ভূমি অফিসের তহশিলদার মো. তারেক বিন ওয়ালী বলেন, “প্রশাসনের কোনো অনুমোদন ছাড়াই স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি গাছটি কাটার উদ্যোগ নেয় এবং কয়েকটি ডাল কেটে ফেলে। ইউএনও স্যারের নির্দেশে ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ কাটা বন্ধ করা হয়েছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হোসেন বলেন, “ভরাসার বাজারের বটগাছ কাটার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় এবং গাছ কাটা বন্ধ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।”
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে কারা অনুমোদন ছাড়া সরকারি জায়গায় থাকা ঐতিহ্যবাহী গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে গাছটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, সে জন্য স্থায়ী সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।