মোঃ শাহজাহান বাশার
দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী খাত চামড়া শিল্প প্রতি বছরই কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই খাতটি এখনও ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সংকটে রয়েছে। সরকার নির্ধারিত দাম থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন না থাকায় সাধারণ কোরবানি দাতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রামীণ এলাকায় সরেজমিন চিত্রে দেখা গেছে, গরুর চামড়া মাত্র দুই থেকে তিনশত টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক স্থানে ছাগল ও বকরির চামড়ার কোনো ক্রেতাই পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে চামড়া অবহেলায় ফেলে রাখছেন, কেউ কেউ এমনকি মাটিতে পুঁতে ফেলছেন—যা চামড়া খাতের জন্য একটি উদ্বেগজনক চিত্র।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তারা জানান, গ্রামাঞ্চল থেকে প্রতিটি চামড়া তিন থেকে চারশত টাকায় সংগ্রহ করলেও শহরে বড় পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে দুই থেকে আড়াইশত টাকার বেশি পাওয়া যায় না। ফলে মাঝখানের ব্যবধানেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ সংগ্রহকারীরা।
ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, সরকার প্রতি বছর চামড়ার ন্যায্য মূল্য ঘোষণা করলেও সেই মূল্য বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। ফলে বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং সিন্ডিকেট সুবিধা নিয়ে পুরো মূল্য কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চামড়া খাত বাংলাদেশের জন্য একটি বড় রপ্তানি সম্ভাবনা বহন করে। তবে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও আধুনিকায়নের অভাবে এই খাতের প্রকৃত সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তারা মনে করেন, ট্যানারি শিল্পের মানোন্নয়ন, সরাসরি সংগ্রহ ব্যবস্থা, এবং মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
এছাড়া চামড়া সংরক্ষণে লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধু দাম ঘোষণা করে কোনো সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই খাতকে সিন্ডিকেটমুক্ত, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল করতে সরকার, প্রশাসন ও ব্যবসায়ী মহলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—কোরবানির চামড়া যেন অবমূল্যায়নের শিকার না হয়, বরং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের মাধ্যমে এই খাত অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।