সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রাও বদলেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে মানুষের মন। এখন মানুষ সম্পর্ক গড়ে হৃদয় দিয়ে নয়, প্রয়োজন দিয়ে। কাছে আসে স্বার্থে, কথা বলে স্বার্থে, পাশে থাকে স্বার্থে। আর প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে খুব সহজেই বদলে ফেলে আচরণ, ভুলে যায় সেই মানুষটিকে, যে একসময় নিঃস্বার্থভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছিল।

সাংবাদিক মোঃ শাহরিয়া বলেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টের অনুভূতিগুলোর একটি হলো, কাউকে মন থেকে বিশ্বাস করার পর বুঝতে পারা যে আপনি তার জীবনে শুধু একটি “প্রয়োজন” ছিলেন। আপনার ভালোবাসা, আপনার আন্তরিকতা, আপনার সময়, আপনার ত্যাগ, সবকিছুই হয়তো তার কাছে ছিল সাময়িক সুবিধা নেওয়ার একটি পথ। কাজ শেষ, সম্পর্ক শেষ। অথচ যাকে ব্যবহার করা হয়, সে মানুষটি সহজে শেষ হয়ে যায় না। সে বেঁচে থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙতে থাকে।

শাহরিয়া আরও বলেন, মানুষ যখন কাউকে ব্যবহার করে, তখন হয়তো সে একবারও ভাবে না, এই মানুষটার রাতগুলো কেমন কাটবে। সে হয়তো ভাবে না, একদিন হঠাৎ বদলে যাওয়া আচরণে মানুষটা কতটা আহত হবে। কারণ কিছু মানুষ খুব সহজেই ভুলে যেতে পারে, কিন্তু কিছু মানুষ সারাজীবন বয়ে বেড়ায় অবহেলার ক্ষত।

তিনি বলেন, আজ সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখায়, হাসে, কথা বলে, মানুষের সঙ্গে মিশে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা নিঃশেষ হয়ে গেছে। কারণ তারা কোনো একসময় কারও স্বার্থের শিকার হয়েছিল। কেউ ভালোবেসে প্রতারিত হয়েছে, কেউ বন্ধুত্বে ভেঙে পড়েছে, কেউ নিজের আপন মানুষদের কাছ থেকেই ব্যবহার হয়ে একদিন একা হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, মানুষ এখন কাউকে কষ্ট দিয়েও অপরাধবোধ অনুভব করে না। বরং নিজের স্বার্থ পূরণ হয়ে গেলে সেটাকেই সফলতা মনে করে। কিন্তু একজন মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার চেয়ে বড় অন্যায় খুব কমই আছে। কারণ ভাঙা বিশ্বাস আর আগের জায়গায় ফিরে আসে না।

সাংবাদিক মোঃ শাহরিয়ার মতে, একজন মানুষ যখন কাউকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে বা বিশ্বাস করে, তখন সে নিজের ভেতরের সবচেয়ে কোমল জায়গাটা তার সামনে খুলে দেয়। আর সেই জায়গাতেই যদি আঘাত আসে, তাহলে মানুষ আর আগের মতো থাকতে পারে না। সে মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস হারায়। সম্পর্কের উপর থেকে আস্থা হারায়। কখনো কখনো নিজের উপর থেকেও বিশ্বাস উঠে যায়।

তিনি বলেন, পৃথিবীতে অর্থ হারালে মানুষ আবার উপার্জন করতে পারে। কোনো জিনিস হারালে আবার পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের মনে গভীর কষ্ট দিয়ে দিলে সেই ক্ষত অনেক সময় সারাজীবন থেকে যায়। কিছু মানুষ মুখে বলে “আমি ভালো আছি”, অথচ তাদের নীরবতা চিৎকার করে বলে দেয় তারা কতটা ভেঙে গেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনের সময় কাউকে পাশে পাওয়া সুন্দর। কিন্তু প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে তাকে অবহেলা করা নিষ্ঠুরতা। কারণ মানুষ কোনো সিঁড়ি নয় যে উপরে ওঠার জন্য ব্যবহার করে পরে ফেলে দেওয়া যাবে। প্রত্যেক মানুষেরই অনুভূতি আছে, সম্মান আছে, ভালোবাসা আছে। সেই অনুভূতিগুলো নিয়ে খেলাধুলা করার অধিকার কারও নেই।

সাংবাদিক মোঃ শাহরিয়া বলেন, আজকাল সম্পর্কগুলো খুব দ্রুত তৈরি হয়, আবার খুব দ্রুত ভেঙেও যায়। কারণ সম্পর্কের ভেতরে এখন সত্যিকারের অনুভূতির চেয়ে স্বার্থ বেশি কাজ করে। কেউ কারও কষ্ট বুঝতে চায় না। সবাই শুধু নিজের লাভটা বুঝতে ব্যস্ত। আর এই স্বার্থপর মানসিকতাই ধীরে ধীরে সমাজকে মানবিকতা শূন্য করে দিচ্ছে।

তিনি সমাজের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কাউকে ব্যবহার করার আগে একবার হলেও ভাবুন, মানুষটা আপনাকে কতটা বিশ্বাস করে। আপনার একটি আচরণ হয়তো তার পুরো জীবন বদলে দিতে পারে। সাময়িক লাভের জন্য কারও মন ভেঙে দেবেন না। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়, কিন্তু মানুষের মনে দেওয়া কিছু কষ্ট কখনো মুছে যায় না।

সাংবাদিক মোঃ শাহরিয়া আরও বলেন, স্বার্থ একদিন শেষ হয়ে যায়। ক্ষমতা একদিন শেষ হয়ে যায়। প্রয়োজনও একদিন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু একজন মানুষকে দেওয়া অপমান, অবহেলা আর মানসিক আঘাত অনেক সময় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার ভেতরে বেঁচে থাকে।

তিনি বলেন, মানুষকে ব্যবহার নয়, মূল্য দিতে শিখুন। সম্পর্ককে স্বার্থ দিয়ে নয়, মানবিকতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখুন। কারণ এই পৃথিবীতে মানুষ হারানোর কষ্টের চেয়ে বড় কষ্ট খুব কমই আছে।