মোঃ শাহজাহান বাশার
দেশে সুস্থ, সৃজনশীল ও দেশীয় ধারার শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী ও যুগোপযোগী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক, কোটা সংস্কার রিটের পিটিশনার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আবদুল অদুদ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এ সময়ে নিজেদের ঐতিহ্য, ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, সংস্কৃতি মানে শুধু গান, নাচ, অভিনয় বা ছবি আঁকা নয়; বরং একটি জাতির সামগ্রিক জীবনবোধ, আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলনই হলো সংস্কৃতি। একটি শক্তিশালী সভ্যতার ভিত্তি গড়ে ওঠে তার নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর। তাই দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
মোহাম্মদ আবদুল অদুদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দেশের সাংস্কৃতিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। পাশাপাশি, বিশ্বসভায় বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেবে।
তিনি বলেন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, বিএফডিসি এবং সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু নির্ধারিত বাজেট বাস্তবায়ন নয়, বরং আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছর পর বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে কোথায় দেখতে চাই— সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মসলিন শাড়ির মতো বিশ্বখ্যাত ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। একইসঙ্গে সোনালী আঁশ পাটসহ দেশীয় শিল্প ও ঐতিহ্যের সুদিন ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
দেশীয় লোকজ সংস্কৃতির আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, বাউল, জারি-সারি, মুর্শেদী, পল্লীগীতি, লালনগীতি, মারফতী ও পালাগানকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কারণ এসব সংগীত এখনও গ্রামবাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
নৃত্যশিল্পের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মনিপুরী নৃত্য, কথক, পাহাড়ি অঞ্চলের আঞ্চলিক নৃত্যসহ দেশীয় নৃত্যধারাগুলোকে প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক উপস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা সম্ভব। একইভাবে বাংলাদেশের নাটক আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক সম্ভাবনাময়। তিনি ২০২২ সালে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসবে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, কোলকাতার সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের নাটকের প্রশংসা করেছেন এবং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে নাটকের মাধ্যমেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি জেলা শিল্পকলা একাডেমিকে আরও সক্রিয় করতে হবে এবং লোকজ সংস্কৃতির বিকাশে বিশেষ টিম গঠন করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি চিত্রশালা, নাট্যশালা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোকে বছরজুড়ে কার্যকর ও প্রাণবন্ত রাখতে হবে।
মোহাম্মদ আবদুল অদুদ বলেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, এস এম সুলতান, কামরুল হাসান কিংবা শহীদুল আলমের মতো বিশ্বমানের শিল্পী তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। একইভাবে হাছন রাজা, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, লালন ফকির, শাহ আবদুল করিম, আব্বাস উদ্দিন ও নীনা হামিদের মতো কিংবদন্তিদের সৃষ্টিকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আরও নতুন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, বছরব্যাপী লোকজ সংস্কৃতির প্রতিযোগিতা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও গবেষণাভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাড়াতে হবে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক গবেষণা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলা সম্ভব।
তরুণ সমাজের মোবাইল ফোন আসক্তি কমিয়ে তাদের জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল সংস্কৃতির দিকে আকৃষ্ট করতে আধুনিক ও গবেষণানির্ভর সাংস্কৃতিক কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ ও জসীম উদ্দীনের সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে আরও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
নিজের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই গান, কবিতা, গজল, আবৃত্তি, অভিনয় ও ছবি আঁকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বুড়িচং উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও বিভিন্ন নাট্য মঞ্চে অভিনয় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে মাইম আর্ট শেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মনে করেন, দেশে একটি ইতিবাচক সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটাতে সরকারকে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, বেসরকারি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা। পাশাপাশি সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর সফল অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগাতে হবে।