মোঃ শাহজাহান বাশার, 

কুমিল্লার ব্যস্ত শাসনগাছা–বুড়িচং–ব্রাহ্মণপাড়া আঞ্চলিক সড়ক—যেখানে প্রতিদিন শত শত সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলাচল করে—সেই সড়ককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী অবৈধ চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘জি*বি’ নামে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই অর্থ লুটপাট, ভয়ভীতি ও হয়রানির বিরুদ্ধে অবশেষে ফুঁসে উঠেছেন চালকরা। ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে বুড়িচং উপজেলার ভরাসার বাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ ও ধর্মঘটের মাধ্যমে তারা তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটান, যা পুরো অঞ্চলে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। শাসনগাছা বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রতিটি সিএনজি চালকের কাছ থেকে প্রতিদিন তিন দফায় ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। অথচ রশিদ দেওয়া হয় মাত্র ১৫ টাকার, যা স্পষ্টভাবে প্রতারণার ইঙ্গিত দেয়। স্থানীয় চালকদের তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০টি সিএনজি এই সড়কে চলাচল করে। গড়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে ৩০০ টাকা আদায় হিসেবে দৈনিক প্রায় ১.৫ থেকে ২ লক্ষ টাকা, মাসিক ৪৫ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা এবং বছরে প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা এর পেছনে রয়েছে—সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই।

‘জি*বি’ নামটি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, এটি কোনো বৈধ বা নিবন্ধিত সংগঠন নয়। বরং এটি একটি ছদ্মনাম, যার আড়ালে সংঘবদ্ধ একটি চক্র কাজ করছে। চালকদের অভিযোগ, সড়কের নির্দিষ্ট পয়েন্টে দাঁড়িয়ে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গাড়ি চলাচলে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি শারীরিক হুমকিরও শিকার হতে হয়। একাধিক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এই চাঁদাবাজি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এর পেছনে বড় সিন্ডিকেট রয়েছে, যাদের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসূত্র থাকতে পারে।”

মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, এই চাঁদাবাজির ফলে চালকদের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। একজন চালক দৈনিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় করলেও এর মধ্যে প্রায় ৩০০ টাকা পর্যন্ত চলে যাচ্ছে চাঁদাবাজদের পকেটে। অর্থাৎ তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই হারিয়ে যাচ্ছে অবৈধভাবে। এতে করে অনেক চালক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন, পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে।

১ মে বেলা ১১টার দিকে বুড়িচং উপজেলার ভরাসার বাজার এলাকায় পরিস্থিতি হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ চালকরা সড়কে নেমে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আটকা পড়ে বিকল্প পথে হেঁটে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হন। এই বিক্ষোভ ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের এক তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী জসিম উদ্দিন দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কৃষি ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ-এর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে বিষয়টি অবহিত করেন। মন্ত্রী আশ্বাস দেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে এবং চালকদের ভোগান্তি দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ সময় এমপি হাজী জসিম উদ্দিন বলেন, “সড়কে কোনো ধরনের অবৈধ চাঁদাবাজি বরদাস্ত করা হবে না, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

তবে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়—এতদিন ধরে প্রকাশ্যে এমন চাঁদাবাজি চললেও প্রশাসন কেন নীরব ছিল? প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরও কেন কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জোরপূর্বক অর্থ আদায় স্পষ্টতই দণ্ডনীয় অপরাধ, যা চাঁদাবাজি ও প্রতারণার আওতায় পড়ে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা সম্ভব।

এই প্রতিবেদনের জন্য একাধিক চালক ও স্থানীয় সূত্রের সঙ্গে কথা বলা হলেও, চক্রটির মূল হোতাদের পরিচয় নিশ্চিতভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। অনেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি, যা এই সিন্ডিকেটের প্রভাব ও ভয়ভীতির মাত্রা আরও স্পষ্ট করে।

সবশেষে বলা যায়, কুমিল্লার এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ‘জি*বি’ নামের আড়ালে যে অবৈধ চাঁদাবাজি চলছে, তা শুধু চালকদের নয়, পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকেই জিম্মি করে রেখেছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি এবং সড়কে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত না করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের আন্দোলন ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।

শ্রমিকের ঘামে অর্জিত আয় যদি সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যায়, তবে সেটি কেবল অন্যায় নয়—এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। এখনই সময়, এই অবৈধ চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করার।